"প্রশাসনের দ্বিমুখী বক্তব্যে ধোঁয়াশা; মহম্মদপুরে দেড় বছর ধরে ৫ মৌজার নামজারি বন্ধ"
মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার পাঁচটি মৌজায় দেড় বছর ধরে ভূমি সেবা কার্যত অঘোষিতভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের ‘মৌখিক’ নির্দেশে নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) আদায় বন্ধ থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন জাঙ্গালিয়া, রুইজানী, মুরাইল (পশ্চিম খণ্ড), ধুপুড়িয়া ও পশ্চিম চরবর্ণি মৌজার কয়েক লাখ মানুষ। জমি কেনাবেচা বা জরুরি প্রয়োজনে অর্থ সংস্থান করতে না পেরে অনেক জমির মালিক এখন দিশেহারা।
মাঠ পর্যায়ের চিত্র অত্যন্ত করুণ। জাঙ্গালিয়া গ্রামের মো. ইদ্রিস মুসল্লী তার বেঁচে থাকার লড়াইয়ের আকুতি জানিয়ে বলেন, ‘আমি চরম অসুস্থ। জমি বিক্রি করে একটু বাঁচার জন্য উন্নত চিকিৎসা করাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু নামজারি বন্ধ থাকায় দেড় বছর ধরে ভূমি অফিসে ঘুরতেছি। আমি এখন অসহায় হয়ে পড়েছি।’ একই অভিযোগ জিল্লুর রহমান ও পিন্টু মোল্লাসহ একাধিক ভুক্তভোগীর। তারা জানান, জমি কিনেও নামজারি করতে না পারায় তারা জমির ওপর কোনো আইনগত অধিকার প্রয়োগ করতে পারছেন না।
এই সংকট নিয়ে জেলা প্রশাসনের দুই শীর্ষ কর্মকর্তার বক্তব্যে দুই ধরণের কারণ উঠে এসেছে, যা জনমনে বিভ্রান্তি বাড়িয়েছে।
মাগুরার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জানান, বিগত জেলা প্রশাসকের সময় থেকেই এই পাঁচটি মৌজার ভূমি সেবা বন্ধ রাখা হয়েছে। তাঁর জানামতে, ওই মৌজাগুলোর রেকর্ডে কিছু ‘প্রিন্টিং ভুল’ বা মুদ্রণজনিত ত্রুটি রয়েছে। এই ভুলগুলো সংশোধনের কাজ চলমান থাকার কারণেই মূলত নামজারি ও খাজনা গ্রহণ সাময়িকভাবে স্থগিত আছে।
অন্যদিকে, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো: মাহবুবুল হক নদী ও চরের ভৌগোলিক পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে বলেন, নদী ভাঙনের ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হওয়ায় এবং নতুন চর জেগে ওঠায় জমির প্রকৃত সীমানা ও মালিকানা নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নদী ওপারে নতুন করে চর জাগায় মালিকানা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত নামজারি ও খাজনা আদায় সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন,
ভূমি আইন সংশ্লিষ্টদের মতে, রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন (SAT Act, 1950) অনুযায়ী, সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ বা আদালতের সরাসরি স্থগিতাদেশ ছাড়া কোনো নাগরিকের নামজারি বা খাজনা বন্ধ রাখার সুযোগ নেই। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জেলা প্রশাসক কিংবা কোনো প্রশাসনিক কর্মকর্তা কেবল ‘মৌখিক’ নির্দেশে সরকারি সেবা বা রাজস্ব আদায় দীর্ঘকাল বন্ধ রাখতে পারেন না। যদি কোনো জমি নিয়ে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকে, তবে সেই সুনির্দিষ্ট দাগ বা খতিয়ানের কার্যক্রম স্থগিত থাকবে, কিন্তু সম্পূর্ণ মৌজার নাগরিক সেবা বন্ধ রাখা নাগরিকের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের শামিল। এছাড়া মুদ্রণজনিত ত্রুটি (Clerical Error) সংশোধনের জন্য দেড় বছর সময় লাগা এবং সেবা বন্ধ রাখাকে প্রশাসনিক অদূরদর্শিতা হিসেবেই দেখছেন তারা।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, মহম্মদপুর উপজেলায় একের পর এক সহকারী কমিশনারের (ভূমি) দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণে যাওয়া এই স্থবিরতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। পূর্বতন এসিল্যান্ড বাসুদেব মালো এবং বর্তমান এসিল্যান্ড মো. সাদমান আকিফ—উভয় কর্মকর্তাই যোগদানের পরপরই প্রশিক্ষণে চলে যাওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ এই পদটি কার্যত শূন্য। বর্তমানে অন্তত ১৩২৭টি নামজারি আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় পড়ে আছে।
প্রশাসনের এক দপ্তর বলছে ‘প্রিন্টিং ভুল’, অন্য দপ্তর বলছে ‘নদী ও চর’। এই দুই অজুহাতের চাপে পড়ে মহম্মদপুরবাসীর নাগরিক অধিকার আজ প্রশ্নবিদ্ধ। একদিকে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ মানবিক সংকটে পড়েছেন। দ্রুত এই আইনি ও প্রশাসনিক জট খুলে দিয়ে ডিজিটাল ভূমি সেবার সুফল মহম্মদপুরবাসীর দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।